বৃহস্পতিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৭

মরণফাঁদ "ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম" এবং একজন বাংলাদেশী গেমারের গল্প।

গত পোস্টে আমরা "ব্লু হোয়েল " গেমস্ সম্মন্ধে লিখেছিলাম।

আগের পোস্টটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

পোস্টটি ফেসবুকে কিছু গ্রুপে শেয়ার হবার পর অনেকেই গেমটি সম্মন্ধে নানা মন্তব্য করেছেন।

অনেকে বলেছেন আমি খেলেছি, অনেকে অনেকের রিলেটিভের কথা শেয়ার করেছে আবার অনেকে এটা বিশ্বাসই করতে চায়নি।

অনেকে গুগল থেকে same নামের (ব্লু হোয়েল) একটি গেম খেলেছেন এবং তাদের ধারনা এটাই সেই ব্লু হোয়েল!

যারা এ ধারনা করেছেন তাদের বলছি, এটা সেই গেম না।  কারন এই গেমটা আপনি কখনোই গুগলে বা ইন্টারনেটে পাবেন না। এটা পেতে হলে আপনাকে ডার্ক ওয়েবে খুজতে হবে। ( ডার্কওয়েব নিয়ে পরবর্তীতে একটা বিস্তারিতো পোস্ট লিখবো।)

তো এবার অাসল কথায় আসি, গত পোস্টটি র পর আমরা এমন একজনকে পাই যিনি এই গেমটা খেলেছেন!

আশ্চার্যজনক হলেও সত্য যে উনি নিজের একটু বুদ্ধির জন্য আজ বেঁচে আছেন এবং আমাদের সাথে অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন।

ব্লু হোয়েল 


কিভাবে/কেন গেমাররা আত্তহত্যা করে? 

অনেকেই এ প্রশ্নটা করে। অবশ্য প্রথমবার শুনার পর আমারো এটাই প্রশ্ন ছিলো যে, কেন একজন গেমার নিজের হাত নিজে কাটবে, নিজের শরীরে সুই ঢুকাবে আর কেনইবা আত্তহত্যা করবে।

অনেকে এ প্রশ্নগুলোর উত্তরগুলো খুজতে গিয়ে অনেককিছু বলে।

যেমন কারো ধারনা এই গেমের মাধ্যমে গেমারকে হিপনোটাইজ করে তারপর আত্তহত্যা করায়। আবার অনেকের ধারনা এর সাথে রয়েছে বিশ্ব খ্যাত "ইলুমিনাতির" হাত (হিপনোটাইজ এবং ইলুমিনাতি নিয়ে পরে সব লিখবো)।

কিন্তু আসলেইকি তাই?

আমরা কেউই জানতামনা কিভাবে এবং কেন একজন গেমার আত্তহত্যা করে। এমনকি অনেক গেমার যারা অল্পের জন্য বেঁচে ফিরেছে তারাও কেউ পরবর্তীতে এই গেমটা নিয়ে কোনভাবেই মুখ খুলতে চায়না, একেবারে কিছুই বলে না। এতে আমরা সহজেই হিপনোটাইজ বা ইলুমিনাতির ঘটনাকি বিশ্বাস করতে বাধ্য হই।

কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন? গেমটিতে আত্তহত্যার সাথে কোন হিপনোটাইজ বা ইলুমিনাতির হাত নেই!

কথাটা শুনে অনেকের মাথায় হাত। কারন অনেকের মনে প্রশ্ন আসে হিপনোটাইজ বা ইলুমিনাতির হাত না থাকলে কেন একজন গেমার স্বজ্ঞানে নিজের শরীরকে কস্ট দিবে?!

কিন্তু সত্যটা হচ্ছে, হ্যা গেমাররা স্বজ্ঞানে এবং বহু কস্টে বাঁচার জন্যই সব করে কিস্তু তবুও তাদের মরতে হয়। :-( হয়তো হাতেগোনা কয়েকজন বেঁচেও যান তবে সারাজীবনের জন্য গেমটির জন্য মুখ বন্ধ করে তারা।

কিভাবে গেমটি খেলে?

আপনি যদি আমাদের গত পোস্টটি দেখেন তবে দেখবেন সেখানে আমরা সবই বলেছি।

ওরা আপনাকে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে বলবে আপনি সেগুলি করবেন।

আপনি না করেও বলবেন করেছেন?

অনেকে বলতে পারে, আরে ভাই ওরা বলবে করতে আর আমিও পরে বলবো করেছি ব্যাস হয়ে গেলো, ওরাতো আর এসে আমার সামনে দাড়িয়ে থাকবে না বা দেখবেওনা আমি  আসলেই করলাম কি না।

কি ভাই এতই সহজ? যদি এতই সহজ হতো তবে আপনার মত বুদ্ধিমানরা সুইসাইড করতো না।

আসলে গেমটিতে আপনাকে ওদের কথামত সব করেই বলতে হবে আমি করেছি। কারন কি জানেন? কারন হচ্ছে,  গেমটিতে ৫০ টি টাস্ক/লেবেল রয়েছে। প্রতিটা লেবেলেই ওই গেম থেকে আপনাকে কিছু একটা করতে বলবে এবং আপনি সেটা করে প্রমান হিসেবে সেই কাজটার একটা ছবি/ভিডিও গেমের নির্দিষ্ট পেজে আপলোড দিবেন এবং গেমের এডমিন /এডমিনেস্টেটর সেটা দেখবে যদি আপনি তাদের কথা অনুযায়ী কাজ এবং প্রুভ জমা দিতে পারেন তবে আপনাকে পরবর্তী লেবেলে খেলতে দেয়া হবে।

এবার আশাকরি বুঝতে পেরেছেন কেন আপনি ধোকাবাজি করতে পারবেন না আর কেনই আপনাকে সব সত্যি সত্যি করতে হবে।

এবার আপনার মনে আরেকটি প্রশ্ন আসবে সেটা হচ্ছে, ওরা আমাকে হাত কাটতে বলবে আর আমি হাত কাটবো? ওরা আমাকে সুই ঢুকাতে বলবে আমি সুই ঢুকাবো? ওরা আমাকে সুইসাইড করতে বলবে আমি করবো?

হাত কেটে গেমপেজে আপলোড দেয়া একটি ছবি


উত্তর হচ্ছে, হ্যা আপনি করবেন কারন আপনি বাধ্য। কারন ওরা খেলার ছলে আপনাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাবে যেখানে আপনাকে ওরা যাই বলবে তাই করবেন, নিজের অনিচ্ছা থাকা সত্বেও করবেন।

কেন ওদের কথা অনুযায়ী কাজ করতে আপনি বাধ্য এবং কিভাবে আপনাকে দিয়ে এসব করাবে?

আপনার উপরের প্রশ্নের উত্তরগুলো দিতে হলে যিনি গেমটা খেলেছেন তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে হবে এবং সেগুলি শুনে আপনার উত্তর আপনি নিজেই পাবেন।

তো শুরু করি।

গেমটাতে যদিও ৫০ টি টাস্ক থাকে তবে তিনি ২০ টি শেষ করেছেন, এরপর কোনভাবে রিস্ক নিয়েই বের হয়ে আসেন। তো গেমটি খেলতে প্রথমেই গেমারকে একটি ডকুমেন্ট দিতে হয়, যেমন:- ন্যাশনাল আইডি কার্ড (NID), জন্ম সনদ/বার্থ সার্টিফিকেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা এ ধরনের কিছু একটা।
কিন্তু যিনি গেমটা খেলেছেন তিনি ফেসবুকে কিছু গ্রুপিংএ যুক্ত থাকায় রিয়েল কার্ড না দিয়ে একটা ফেইক কার্ড দিয়ে গেমটা খেলা শুরু করে।  এরপর ৩-৪ লেবেল একেবারেই easy হয়, যেমন আপনাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে গেমে ঢুকতে বলবে, যেকোন একটা ফানি কাজ করতে বলবে আর মজার ছলে যে কেউই এসব করবে। সম্ভবত ৩/৪ লেবেলে ওনার (যিনি অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন) কাছ থেকে ছবি চাইলো এবং বলা হলো ছবিটা যেন ওনার আগেরবার দেয়া ডকুমেন্টের ছবির সাথে মিল থাকে এবং কথামত উনি যার ছবি দিয়ে ফেইক ডকুমেন্ট বানিয়েছে তারই একটা ছবি দেয়। ওপার থেকে এডমিন/এডমিনিস্টেটর ছবি দেখে ওনাকে পরবর্তী লেবেলের সুযোগ দেয়।

এর পরের গুলোও মজা  লেভেল, ভালো কাজ ফানি কিছু করতে বলবে আপনি করবেন। এরপর কয়েক লেবেলে গিয়ে ওনার ফেসবুক আইডি লিংক চাইলো।

উনিও বুদ্ধি করে সেই আগের দেয়া ছবিগুলার সাথে কোন একটা দিয়ে একটা ফেসবুক আইডি বানিয়ে সেটার লিংক দেয়।

এর পরের কয়েকটি লেবেলও মোটামুটি ভালো এবং সহজ। এরপর ওনার কাছে চাইলো একটা নগ্ন ছবি।  জ্বি ঠিকই পড়েছেন ওনার নগ্ন (উলঙ্গ ছবি)। উনিও ফটোশপ মেরে আগের ছবির কোন একটা থেকে একটা মুখ কোন একটা নগ্ন ছবিতে নিখুতভাবে বসিয়ে লেভেল পার করে।

এরপর চাইলো ফেসবুক আইডির পাসোয়ার্ড। উনি দিলেন। কারন এখন হর হামেসাই বিভিন্ন সোশাল সাইট বা বিভিন্ন ক্রয় বিক্রয় সাইটে ক্রেতারা নিজের পাসোয়ার্ড দেয় আর এটা সিকিউর থাকে। আর এখানে নগ্ন ছবি যেহেতু সিকিউর পাসোয়ার্ডতো সামান্য একটা ব্যাপার মাত্র।

এরপর আরো দু একটা মজার লেভেলে এরপর শুরু হয় আসল খেলা।

ধরুন গেমটাতে প্রথম ১০ টা মজাদার এবং সহজ লেভেল থাকে আর এই ১০ লেবেলে ওরা খেলার ছলে আপনার কাছ থেকে এমন সব তথ্য হাতিয়ে নিবে যেটা আপনার বেস্ট ফ্রেন্ড বা পৃথিবীর কেউই জানে না। আপনিও খেলার ছলে দিয়ে দিবেন। কারন তখন দেখবেন আপনার লেবেলের অনেকেই উপরের লেবেলে চলে গেছে তাই আপনিও তথ্যগুলা দিয়ে উপরে উঠতে চাইবেন।

যে তথ্যগুলা ওরা গেমারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় সেগুলার মধ্য কিছু হচ্ছে যেমন :- আপনার ছবি, আপনার যেকোন একটা সরকারি/বেসকারী ডকুমেন্ট, আপনার নগ্ন ছবি, এমনকি আপনার হস্তমৌথুনের (নিজের যৌন চাহিদা নিজে মেটানোর প্রক্রিয়া) ভিডিও পর্যন্ত। 

এরপর যখন আপনার সব সেন্সেটিভ তথ্য হাতানো শেষ হবে তখনই আপনাকে চেলেন্জ করা হবে হাত কাটা বা সুই ঢুকানো বা এ ধরনের কিছু একটা করে তাদের প্রুপ দেয়া। হাত কাটার ক্ষেত্রে অবশ্যই হাতটা কেটে সেটা মুখের উপর রেখে ছবি তুলে সেটা গেম পেজে দিতে হবে।

এখন আপনি বলবেন আমি কাটবো না গেমটাই আর খেলবো না তাইলেইতো হবে।

কিন্তু না, আপনি সেটা করতে পারবেন না কারন আপনি ততক্ষনে বহু দেরী করে ফেলেছেন।
কার কি জানেন?
কারন ততক্ষনে অাপনি গেমটার এমন একটা পর্যায়ে চলে এসেছেন যেখান থেকে আর ফিরে আসার রাস্তা নেই। না পারবেন সেটা সহজে আনইনস্টল করতে না পারবেন গেম থেকে বের হতে। আপনি যখন লেবেলটার কাজটা করবেন না অথবা লিভ নিতে চাইবেন তখনি ওরা আপনাকে ওপেন থ্রেড দিবে। থ্রেডগুলো হয় "তোমার এমন এমন তথ্যগুলা আমাদের কাছে আছে হয় তুমি লেবেলটা complete কর নাহয় তোমার তথ্যগুলা আমরা ফাঁস করে দিবো এমনকি তোমার আইডিতে (সেটা হতে পারে ফেসবুক, টুইটার বা যেকোন সোশাল মিডিয়া) তোমার নগ্নতার ছবি/ভিডিওগুলা পোস্ট/কমেন্ট করে দিবো)।

এবার আপনার কাছে আসি। কেউ একজন যদি বলে আমার জন্য তুমি এটা কর না হয় তোমার নগ্নতা সবার সামনে ফাঁস করবো তখন আপনি কি করবেন?

নিজের সম্মান বাচানোর জন্য নিজেকে কস্ট দিয়ে হলেও আপনি তার কাজটা করবেন এবং "ব্লু হোয়েল" গেমাররাও ঠিক এমনই বাধ্য হয়ে নিজেকে কস্ট দিয়ে হাত কাটে সুই ঢুকায়। এসবের মধ্যে কোন হিপনোটাইজ বা ইনুমিনাতি কাজ করে না কাজ করে সম্মান বাঁচানোর বাধ্যবাধকতা।

এরপর হাত কাটে হয়তো সুই ফুটায়। এভাবেই গেমটা শেষ পর্যায়ে আসতে শুরু করে।

 যেহেতু গেমটা তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য গেমারকে আত্তহত্যার মাধ্যমে মারা তাই তারা ৫০ তম টাস্ক/লেভেলে গেমারকে ৫ তালা বা তারো বেশী উচু ভবনের ছাদ থেকে লাপ দেয়া ভিডিও আপলোড দিতে বলে। কিন্তু কেউই করতে না চাইলেও গেমার করতে বাধ্য কারন তার সব তথ্য তাদের কাছে।

এরপর গেমার ওদের হাত থেকে বাচতে শেষ লেবেলটি পুরনের জন্য ছাদ থেকে লাপ দেয়, কিন্তু হায় এরপর আর হাতেগোনা কয়েকজনই বাঁচে।

কেউ হয়ে উঠে পরের দিনের বিশ্ববাসীরকাছে পত্রিকার শিরোনাম কেউ হয়তো ভাগ্যের জন্য বেচে যায় তবে থাকতে হয় কোমায়। হয়তো পঙ্গুত্ব বরন করে নিয়ে জীবনের শেষ দিনের জন্য।

আশাকরি সবকিছু পড়ার পর আপনাদের মনের প্রশ্নগুলো কেটেছে। তবুও যদি কোন প্রশ্ন থাকে করবেন চেস্টা করবো উত্তর দেয়ার।

পোস্টটি ভালো লাগলে অথবা পোস্ট সম্পর্কে কোন অভিযোগ থাকলে দয়াকরে কমেন্ট করে জানাবেন। আপনার একটি সুন্দর মতামত লেখককে আরো সুন্দর পোস্ট লেখার অনুপ্রেরণা জোগাবে।

ধন্যবাদ।
ইমুজিইমুজি