Wednesday, January 16, 2019

ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেমের যতো অজানা কথা!

দিন যত এগুচ্ছে পৃথিবী তত ডিজিটাল হচ্ছে। আর তারসাথে পাল্লা দিয়ে উন্নত হচ্ছে প্রযুক্তি।
আগে যেখানে ছেলেমেয়েরা সময় কাটানোর জন্য বাড়ির মানুষের সাথে বসে আড্ডা দিতো অথবা খেলার মাঠে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতো এখন সেরকম দৃশ্য খুবই বিরল।

কারন এখন সবাই সময় কাটানোর জন্য বেছে নিয়েছে অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো।
আর কেউ কেউ মাঠে খেলার বদলে বেছে নিয়েছে অনলাইনই  গেমস্।
ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম

জ্বি আজ আমরা সেই রকমই একটি গেমস্ নিয়ে কথা বলবো। শুরুতেই বলে নিই গেমস্ টির নাম " ব্লু হোয়েল " (Blue Whale) বা অনেকে বলে থাকেন "ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেমস্"  (Blue Whale Suicide Game)।

প্রথমে জেনে নিই গেমস্ টির নামকরন সম্পর্কে।

ব্লু হোয়েল গেমস্ এর "ব্লু হোয়েল" অংশটি নামকরন করা হয় সমুদ্রের নীল তিমির নাম অনুযায়ী (blue whale এর বাংলা নীল তিমি)।
যেহেতু নীল তিমি হচ্ছে আত্তহত্যার প্রতীক এবং গেমস্ টির গেমারদেরও সর্বোশেষ পরিনতি অাত্তহত্যা তাই এর গেমস্ টির নাম "ব্লু হোয়েল বা ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেমস্"।

ব্লু হোয়েল গেমসটি তৈরি হয় রাশিয়াতে এবং যদিএ বর্তমানে তা অনেকগুলো দেশে ছড়িয়ে গেছে!

গেমস্ টি কিভাবে খেলে?

ব্লু হোয়েল গেমস্ টিতে রয়েছে ৫০ টি লেভেল যা গেমার্সকে ৫০ দিনে খেলতে হবে।

তবে শুনতে সহজ হলেও কাজে ততটা সহজ নয়। আর এর লেভেলগুলো এতটাই কস্টকর যে সবাই এগুলোকে আত্তনির্যাতনমূলক লেভেল বলে।

আর বলবেইনা কেন? কিছু লেভেলে গেমার্সকে এমনই সব কাজ করতে হবে যা সত্যিই ভয়ংকর এবং শরীর শিউরে উঠার মত। যেমন : শরীরে ৫০ টি সুই ঠুকিয়ে দেয়া, হাত কেটে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা ইত্যাদি। এবং সর্বশেষ (৫০ তম)  লেভেল হচাছে আত্তহনন বা আত্তহত্যা।

নীল তিমির আকারে হাত কেটে  গেম পেজে পোস্ট দেয়া একটি ছবি

এখন আপনার মনে সহজেই প্রশ্ন উঠতে পারে কোন মানুষ কেন এমন পাগলামি করবে? কেনইবা নিজের শরীর নিজে ক্ষতবিক্ষত করবে?

তাহলে আপনার প্রশ্নের উত্তর শুনুন। গেমস্ টার প্রথম কয়েকটি লেভেল হবে অনেক মজাদার, যেমন আপনাকে ভোর ৪ টায় উঠে পড়তে বসতে হবে, রাত ২:৩০ এ উঠে ভূতের Horror Movi দেখতে হবে,  গভীর রাতে একা একা হাটতে হবে ইত্যাদি। যার ফলে একজন গেমার সহজেই আকৃষ্ট হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে লেভেলগুলোও কঠিন হতে থাকে।

 এবং গেমস্ টির বিশেষ একটি নিয়ম হচ্ছে প্রতিটা লেভেল শেষ করে সেই লেভেলে করা কাজগুলো গেমের নির্দিষ্ট পেজে পোস্ট দিতে হবে এবং আপনি লেভেলটি জয়ী হলে আপনাকে পরবর্তী লেভেলের কাজ দেয়া হবে।

গেমটির জন্য যত মৃত্যু! 

সাম্প্রতিককালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একাধিক দুর্ঘটনা এবং আত্মহত্যার ঘটনায় নাম জড়িয়েছে ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’ নামের এই সোশ্যাল গেমিং-এর। এক পরিসংখ্যানগত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, গত তিন মাসে রাশিয়া এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় মোট ১৬ জন তরুণী আত্মহত্যা করেছেন। এতো কম সময়ের মধ্যে এত জন অল্পবয়সী মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনা বিস্মিত করেছিল পুলিশকেও। এদের মধ্যে সাইবেরিয়ার দুই স্কুলছাত্রী য়ুলিয়া কনস্তান্তিনোভা (১৫) এবং ভেরোনিকা ভলকোভা (১৪) একটি বহুতলের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে বলে পুলিশ রিপোর্ট থেকে জানা যায়। তদন্তকারী অফিসারদের তখন মনে হয়েছিল, এই সমস্ত আত্মহনন হয়তো বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়, হয়তো কোনও গোপন যোগসূত্র রয়েছে এদের মধ্যে। মৃত্যুর পূর্বে য়ুলিয়া তার সোশ্যাল পেইজে একটি তিমির ছবি

পোস্ট করে লিখে যায় ‘সমাপ্ত’। তদন্তে নেমে পুলিশের নজরে আসে এই ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’। পুলিশ আরো ধারণা করতে থাকে সারা বিশ্বে অন্তত ১৩০ জন মানুষের আত্মহননের জন্য পরোক্ষে দায়ী এই অনলাইন গেইম।

 শুধু এটাই নয়, গত কয়েকদিন আগেও  ভারতের এক কিশোর পাঁচ তলা থেকে ঝাপ দিয়ে আত্তহত্যা করে । এই ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেমের কারনে।

পুলিশের ধারণা, ইদানিংকালে আত্মঘাতী ১৬ জন তরুণীই এই গেমের ৫০তম টাস্কের শর্ত অনুযায়ী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। রাশিয়া পুলিশের আশঙ্কা, সাম্প্রতিককালে গোটা বিশ্বে আত্মঘাতী হওয়া অন্তত ১৩০ জনের আত্মহননের পেছনে রয়েছে এই ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’।

আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে রাশিয়ার পুলিশ জানায়, য়ুলিয়া এবং ভেরোনিকাসহ আত্মহত ১৬ তরুণীই সুইসাইড গেম-এ আসক্ত ছিল। তারা একেকজন ছিল নিষ্ঠাবান খেলোয়াড়। প্রায় উন্মাদনার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল তাদের জীবনে এই খেলা। খেলায় নিজেকে জয়ী দেখতে চাওয়ার নেশায় তারা নিজেকে শেষ করে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করেনি। প্রত্যেকে প্রতিযোগীই খেলার ৫০তম লেভেল পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। এই ৫০তম লেভেলেই প্রতিযোগীকে আত্মহত্যা করতে হয়। আর এভাবেই এসব তরুণী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

আরো পড়ুন:


তদন্তে নেমে পুলিশ হন্যে হয়ে খুজতে থাকে ব্লু হোয়েল গেমের পেজটির এডমিনকে। পরিবর্তীতে জানা যায় সেই পেজের প্রধান এডমিন এবং গেমটির আবিষ্কারকের নাম  "ফিলিপ"। এরপর পুলিশ হন্য হয়ে খুজতে থাকে এই ফিলিপকে।

 কিন্তু সকলের মনেই প্রশ্ন জাগে কে এই ফিলিপ ? এবং কেনই বা তার জন্য নিজের প্রাণ দিয়েছেন তরুণ-তরুণীরা?

রাশিয়ার পুলিশের প্রাপ্ত সূত্র হতে জানা যায়,ফিলিপ ছিল রাশিয়ারই একজন বাসিন্দা যার বয়স ২১ বছর। সে ভিকোন্তাক্তে নামক সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’ নামের এই সোশ্যাল গেমিংটির পেজের একজন অ্যাডমিন ছিল। অবশেষে অনেক তদন্ত চালিয়ে পুলিশ ফিলিপ-কে গ্রেফতার করে।
ব্লু হোয়েলের আবিষ্কারক ফিলিপ

পুলিশের তীব্র জেরায় এই গেমর কথা স্বীকারও করে নেয় ফিলিপ। কিন্তু সে এইসব মৃত্যুর দায় নিতে অস্বীকার করে এবং সে কোনোভাবেই তার এই অনলাইন গেমকে অপরাধ বলে মানতে রাজি নন।

ফিলিপের বক্তব্য, সে তার এই খেলার মধ্য দিয়ে সমাজের ‘শুদ্ধিকরণ’ করছে। ফিলিপ গর্বের সাথে বলতে থাকে, সমাজে যাদের বেঁচে থাকা উচিত নয়, তাদেরকে সমাজ থেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়াই ছিল তার লক্ষ্য।
আরো পড়ুন:


ফিলিপের মুখে এই সমস্ত কথা শুনে পুলিশের মনে তার মানসিক সুস্থতা নিয়েই সন্দেহ জাগে। ফিলিপ বর্তমানে সেন্ট পিটার্সবার্গের ক্রিস্টি জেলে বন্দী অবস্থায় অাছে।

কিন্তু কথা হচ্ছে, এডমিন গ্রেফতার হলেই সোশ্যাল মিডিয়ার একটি পেজ বন্ধ হয়ে যায় না। ফিলিপকে বন্দী করা গেলেও তার পেজের কার্যক্রম থেমে থাকেনি এবং পেজটি বন্ধও হয়নি। ফলে পেজটি নিয়ে পুলিশের মনে চিন্তার রেখা থেকেই যাচ্ছে। বর্তমানে ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’টি রাশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর ফলে চিন্তা বাড়ছে ইউরোপের একাধিক মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানীদের। স্কুল কলেজ থেকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং অভিভাবকদের সর্তক করে দেয়া হচ্ছে যেন তারা তাদের সন্তানদের এই গেম থেকে দূরে রাখে। তাই সুইসাইড গেমের এই পেজটিকে নিষিদ্ধ করার কথাই ভাবছে পুলিশ-প্রশাসন।

সবকিছুই কেমন অদ্ভুত মনে হয় না? একটা সাধারণ গেম কীভাবে উচ্ছল কিশোরীর জীবন কেড়ে নিচ্ছে! মনোবিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কেন একটা গেমের কারণে এতগুলো ছেলে মেয়ে আত্মহত্যা করছে তা খুবই উদ্বেগজনক । বিষয়টির গভীরে অনুসন্ধানের জন্য রাজনীতিবিদদের তারা বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন।

জীবনের ব্যস্ততায় আমরা কমবেশি সকলেই একটু একটু করে মনোবেদনায় আক্রান্ত হচ্ছি, তা না হলে আমাদের মধ্যকার সোশ্যাল ভেল্যুগুলো কেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে? কেন আমরা আর সুখে, দুঃখে, আনন্দ, বেদনায় নিজেকে আর আন্দোলিত করতে পারি না? পরিবারের বা সমাজের সকলের মাঝের বন্ধন কেন আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যাচ্ছে? এসবই কি প্ররোচনা যোগাচ্ছে এমন গেম খেলতে? এবার হয়তো সবার ভাবার সময় এসেছে।

পোস্ট সম্পর্কে যেকোন মতামত জানাতে চাইলে দয়াকরে কমেন্ট করুন।
ইমুজিইমুজি